খনিজ সম্পদ বলতে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত বস্তুসমূহ যাদের রাসায়নিক উপাদান ও পারমাণবিক গঠন সুনির্দিষ্ট এবং যেগুলি অজৈব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্ট, তাদের খনিজ বলে। সহজ ভাবে বলতে চাইলে যে সকল পদার্থ মাটির নিচে মালিকানা বিহিন পড়ে থাকে এবং তা উঠিয়ে কাজে লাহানো যায় তাদের খনিজ সম্পদ বলে। আবার, যে সব খনিজ দ্রব্যের কার্যকারিতা আছে, তাদের খনিজ সম্পদ বলে । বাংলাদেশে অনেক ধরনের খনিজ সস্পদ রয়েছে,যেমন: গ্যাস, তেলক্ষেত্র, কয়লা, চুনাপাথর, গ্রানাইট, ধাবত খনিজ, চীনামাটি ইত্যাদি। খনিজ সম্পেদ দেশের অনেক উপকারে আসে। খনিজ সম্পদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভুমিকাউ অনেক বড় হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও অনেক ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে, তার মধ্যে যেটা সমচেয়ে বেশি রয়েছে তা হচ্ছে গ্যাস ।

খনিজ সম্পদ প্রকল্প

দেশের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ খনিজ, তেল ও গ্যাস করপোরেশন রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৭ এর মাধ্যমে ২৬ মার্চ, ১৯৭২ সালের (বিএমওজিসি) গঠিত হয়। এবং ১৯৭২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১২০ এর মাধ্যমে দেশের খনিজ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে “বাংলাদেশ খনিজ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন করপোরেশন” (বিএমইডিসি) নামে অপর একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এরপর ১৯৭৪ সালের ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১৫ এর মাধ্যমে বিওজিসি’কে ‘পেট্রোবাংলা নামে সংক্ষিপ্ত নামকরণ করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৭ নং অধ্যাদেশ-এর মাধ্যমে অয়েল এন্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৬১-কে বাতিল করে অয়েল এন্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (ওজিডিসি) বিলুপ্ত করা হয় এবং উহার সম্পদ ও দায় পেট্রোবাংলা’র উপর ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৩ নভেম্বর জারিকৃত অধ্যাদেশ নং ৮৮ এর মাধ্যমে নবগঠিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম দ্রব্যাদি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশে যে সকল খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় তাদের সংখিপ্ত বর্নণা:-

গ্যাস

আমাদের দেশে বর্তমানে ব্যবহূত মোট জ্বালানির ৭০% প্রাকৃতিক গ্যাসের দ্বারা মেটানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যত জ্বালানি চাহিদার বেশিরভাগ এ খাত থেকেই পূরণ হবে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সর্বাধিক ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে যার পরিমাণ মোট ব্যবহারের ৪৪ শতাংশ, যার মাধ্যমে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬৮ শতাংশ পাওয়া যায়। এর পরেই রয়েছে সার উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার যার পরিমাণ মোট ব্যবহারের ২৮ শতাংশ এবং শিল্প, গৃহস্থালী, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের ব্যবহার ২২ শতাংশ। সরকারি ও বেসরকারি খাতে ১২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে এবং দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ ৯০০ থেকে ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। ছোট বড় মিলিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ২২টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২০টি গ্যাসক্ষেত্রে পরিমাপকৃত। যাদের মধ্যে গ্যাসমজুতের পরিমাণ প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বাকি ২টি গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কন্ডেনসেট পাওয়া যায় তাই এদেরকে ভেজা গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ভেজা গ্যাসক্ষেত্রসমূহ হচ্ছে: বিয়ানীবাজার (প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে ১৬ ব্যারেল কন্ডেনসেট), জালালাবাদ (প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে ১৫ ব্যারেল কন্ডেনসেট) এবং কৈলাশটিলা (প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে ১৩ ব্যারেল কন্ডেনসেট)।

তেল

১৯৮৬ সালে সিলেটের হরিপুরে দেশের একমাত্র খনিজ তেলক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয়। সেখানে তেলের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল। যার মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল। হরিপুর তেলক্ষেত্র থেকে তেল উৎপাদন শুরু হয় ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে । তেল উৎপাদন স্থগিত হয়ে যায়১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে। এছাড়া তেল খনিজের কোন সম্ভাবনা পওয়া যায়নি।

কয়লা

১৯৬২ সালে জামালগঞ্জে প্রথম কয়লা খনি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কয়লার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৫সালে জিওলজিকাল সার্ভে অফ বাংলাদেশ দিনাজপুরে কয়লা আবিষ্কার করেছিল এবং ১৯৯৭ সালে বিএইচপি বিলিটন ফুলবাড়ীয়তে কয়লা আবিষ্কার করে। এছাড়া ১৯৮৯ সালে রংপুর জেলায় কয়লা আবিষ্কার হয়েছিল। গ্লোবাল কয়লা ম্যানেজমেন্ট পিএলসি ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলিতে আনুমানিক ২ বিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে। আমাদের দেশের মোট শক্তি উৎপাদনের দুই শতাংশ কয়লা দ্বারা করা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে শক্তি উৎপাদন ২ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।

চুনাপাথর

চুনাপাথর এক ধরণের কার্বনেট পলল শিলা। এটি বেশিরভাগ খনিজ ক্যালসাইট এবং আরগোনাইটের সমন্বয়ে গঠিত যা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের বিভিন্ন স্ফটিক রূপ।দেশের উত্তর-পূর্বভাগে অবস্থিত টাকেরঘাট এলাকায় ১৯৬০-এর দশকের প্রথমভাগে ইয়োসিনযুগীয় চুনাপাথরের একটি ক্ষুদ্র মজুত থেকে চুনাপাথর আহরণ করে তা একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে সরবরাহ করা হয়। জি.এস.বি ১৯৯০-এর দশকের মধ্যভাগে নওগাঁ জেলার জাহানপুর ও পরানগর এলাকায় যথাক্রমে ভূ-পৃষ্ঠের ৪৯৩ থেকে ৫০৮ মিটার ও ৫৩১ থেকে ৫৪৮ মিটার গভীরতায় চুনাপাথর আবিষ্কার করে।

গ্রানাইট

গ্রানাইট হ’ল একটি মোটা দানাযুক্ত ইগনিয়াস শিলা যা বেশিরভাগ কোয়ার্টজ, ক্ষার ফেল্ডস্পার এবং প্লেজিওক্লেজ সমন্বয়ে গঠিত। এটি সিলিকা এবং ক্ষারীয় ধাতব অক্সাইডগুলির একটি উচ্চ সামগ্রীর সাথে ম্যাগমা থেকে গঠন করে যা আস্তে আস্তে ভূগর্ভস্থকে শক্ত করে তোলে। এটি পৃথিবীর মহাদেশীয় ভূত্বকগুলিতে সাধারণ, যেখানে এটি বিভিন্ন ধরণের জ্বলন্ত অনুপ্রবেশে পাওয়া যায়। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর ও ভোলাগঞ্জ এলাকার গন্ডশিলাসমূহের উৎসশিলা হলো আগ্নেয় বা রূপান্তরশিলা। এ সব অঞ্চল ছাড়াও সংলগ্ন পর্বতমালা থেকে উৎসারিত অসংখ্য পাহাড়ি নদীর তলদেশে ও নদীর কাছাকাছি এলাকায়ও গন্ডশিলা মজুত হয়। টেকনাফ-কক্সবাজার সমুদ্রতীরের ৭টি স্থানে গন্ডশিলার আলাদা আলাদা মজুত রয়েছে।

চীনামাটি

চীনামাটি দিয়ে বাসন কোশন বানানো হয়। চীনামাটি দিয়ে বানানো বাসন শক্ত এবং স্বচ্ছত হয়। চীনামাটি বলতে মূলত কেয়োলিন কাদা মণিক দিয়ে গঠিত সিরামিক শিল্পে ব্যবহার্য উন্নতমানের কাদাকে বোঝানো হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে অনেক জায়গাতে চিনামাটি রয়েছে। ভূ-পৃষ্ঠের উপরে বা ভূ-পৃষ্ঠের সামান্য নিচে শেরপুর জেলার ভুরুংগা (১৩ হাজার টন) নেত্রকোণা জেলার বিজয়পুর (২৫ লক্ষ ৭ হাজার টন), ও চট্টগ্রাম জেলার হাইটগাঁও, কাঞ্চপুরে চিনামাটি রয়েছে। এছাড়া এলাহাবাদ দিনাজপুর আবিষ্কৃত হয়েছে।

ধাবত খনিজ

ধাতব খনিজগুলি একমাত্র খনিজ যা এক বা একাধিক ধাতব পদার্থ এগুলো সাধারণত চকচকে পৃষ্ঠতল থাকে।এগুলো তাপ এবং বিদ্যুতের সঞ্চালক,এদর প্রধানত সরঞ্জাম এবং অস্ত্র তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। খনিজ মজুত অনুসন্ধান চালিয়ে জি.এস.বি বেশ কটি সম্ভাব্য ধাতব খনিজ বলয় চিহ্নিত করতে সমর্থ হয়েছে। দেশের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ নমুনা থেকে চ্যালকোপাইরাইট বোর্নাইট, চ্যালকোসাইট, কোভেলাইন, গ্যালেনা, স্ফালারাইটের মতো ধাতব খনিজ পাওয়া গেছে।

খনি ও খনিজ সম্পদ আইন

খনিজ সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশের কিছু আইন আছে ১৯৯২ সালে খনি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে আইন প্রনয়ণ করা হয়। এটি ৩৯ নং আইন। আইনগুলো বুঝতে সহজ করার জন্য হুবুহু দেয়াহল।

(ক) “অনুসন্ধান ও অন্বেষণ লাইসেন্স” অর্থ খনি ও খনিজ সম্পদ আবিস্কারের উদ্দেশ্যে কোন ভূমিতে খনিজ বা খনিজ সম্পদ থাকার সম্ভাবনা পরীক্ষা বা অনুসন্ধানের জন্য প্রদত্ত লাইসেন্স;

(খ) “খনিজ সম্পদ” অর্থে এমন বস্তু যাহা সাধারণতঃ প্রাকৃতিকভাবে ভূত্বকের অংশ হিসাবে পাওয়া যায় বা ভূ-ত্বকের মধ্যস্থিত বা উপরিভাগস্থ পানিতে দ্রবনীয় বা নিলম্বিত থাকে, বা উক্তরূপ বস্তু হইতে নিষ্কাশন করা যায় এমন বস্তুকে বুঝাইবে,

১. সিরামিক, রিফ্রক্টরী ও শোষণক্ষম সম্বন্ধীয় জিনিস তৈরীতে ব্যবহৃত ক্লে;
২. রাসায়নিক জিনিস ঘষামাজা ও ঢালাই করার বালুর জন্য ব্যবহৃত সিলিকাবালুসহ সিলিকা
৩. অক্ষত, খণ্ডিত ও স্লাব আকারে ব্যবহৃত বালু, নুড়ীপাথর বা শিলা
৪. সকল প্রকার চুনাপাথর;
৫. পিটসহ সকল প্রকার কয়লা;
৬. কয়লা বা শেইল (shale) খনন, নিষ্কাশন বা উত্পাদন কাজের সহিত সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন এবং কয়লা খনন কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় মিথেন (methane) গ্যাস;
৭. কয়লা বা শেইল প্রাপ্তিস্থানে উক্ত পদার্থের প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নিষ্কাষিত বা উত্পাদিত খনিজ তৈল বা গ্যাস ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;

কিন্তু-

১. জীবিত কোন বস্তু;
২. সামুদ্রিক পানি হইতে নিষ্কাষিত লবন, বা
৩. পানি;
৪. দি পেট্রোলিয়াম এ্যাক্ট ১৯৭৪-এর আওতাধীন পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস; ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে না;
৫. “খনি” অর্থ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও অর্জনের উদ্দেশ্যে খনন কাজ;
৬. “বিধি” অর্থ এই আইনের অধীন প্রণীত বিধি;
৭. “ভূমি” অর্থে-
৮. নদী, খাল, জলপ্রবাহ, জলপ্লাবিত এলাকার তলদেশ;
৯. বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগরের অন্তরস্থ কিংবা বাংলাদেশের মহীসোপানের উপরিস্থ মহাসাগরের অন্তঃস্থ সকল ভূমি;
১০. ভূমির অভ্যন্তরস্থ, উপরিস্থ ও উপরিভাগস্থ পানি কে বুঝাইবে৷