বৈদেশিক সম্পর্ক একটি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় অংশ। এ নীতির ওপর একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভরশীল। পরাষ্ট্রনীতিতে সূক্ষ্ণতর ভূলের জন্য একটি দেশ ধ্বংশ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

একটি দেশের পরাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিদেশ বিষয়ক নীতি নামেও পরিচিত। নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত কল্পে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সার্বিক সম্পর্ক স্থাপন এবং যোগাযোগ নিশ্চিতার্থে যে পন্থা বা কৌশল অবলম্বন করে তাই দেশের পরাষ্ট্রনীতি। পরাষ্ট্রানীতি সংক্রান্ত অধ্যয়নকে বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষণ নামে অভিহিত করা হয়।

পূর্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় এ পরাষ্ট্রনীতির তেমন কোনো গুরুত্ব ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়ন এবং আন্তঃদেশীয় কার্যক্রমের কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় পরাষ্ট্রনীতি অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

প্রতিটি দেশ সুষ্ঠ সুশৃঙ্খলভাবে চলার জন্য পররাষ্ট্রনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সকল দেশর মত বাংলাদেশও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশের সংবিধান দ্বারা নির্বাচিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কৌশল এবং তার বৈদেশিক সম্পর্কের গভীরে বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য গঠিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অংশের নির্দেশনা অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি প্রনয়ন ও প্রয়োগ করে।

সংবিধানে বৈদেশিক নীতির মূল নীতিমালা রয়েছে; এতে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কটিকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সাম্যের প্রতি সম্মান, অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা এবং জাতিসংঘের আইন অনুসারে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিগুলির প্রতি শ্রদ্ধার নীতিগুলির ভিত্তিতে নির্ভর করবে।

সকলের সাথে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এবং কারও প্রতি বিদ্বেষের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি প্রত্যাশিত বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করছে। ইউএন, নিরপেক্ষ আন্দোলন, ওআইসি, কমনওয়েলথ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সক্রিয় সদস্য হিসাবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়নের প্রচার করে। বাংলাদেশ দক্ষিণ-এশিয়ার আটটি দেশ-বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার এবং আফগানিস্তান সমন্বয়ে সার্ক-আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম গঠনের পথিকৃত হয়েছিল। বাংলাদেশ এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ফলাফলগুলির মধ্যে একটি হল স্যাপটা বা দক্ষিণ এশীয় প্রেফেরেনশিয়াল ট্রেডিং অ্যারেঞ্জমেন্ট গঠন ও বাস্তবায়ন।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার মূলত অর্থনৈতিক লক্ষ্যে একটি সক্রিয় এবং আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করছে। এটি গর্বের বিষয় যে বর্তমান সরকারের উদ্বোধনী বছরে বিশ্বের আটজন বিশিষ্ট রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৫১ তম অধিবেশনে ভাষণ দেন।

দ্বিপক্ষীয় ফ্রন্টে, গঙ্গার জলের ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সাথে দীর্ঘকালীন বিরোধ অবশেষে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ঐতিহাসিক ৩০ বছরের জল-ভাগ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে অন্যান্য অসামান্য বিষয়গুলিও ধীরে ধীরে সমাধান করা হচ্ছে।এই সকল বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখেই পরাষ্ট্রনীতির উপর কঠোর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের বিশেষত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পরিবহন ও পর্যটন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক ও উপ-আঞ্চলিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এগুলির অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্লোবালাইজড বিশ্ব অর্থনীতির পটভূমিতে, দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ গ্রহণে পিছিয়ে থাকার সামর্থ্য রাখে না।

বাংলাদেশের মৌলিক পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের সংবিধানের নিম্নোক্ত বিধানসমূহ থেকে উদ্ভূতঃ
রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি সম্মান বজায় রেখে, অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে-

  • আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ না করা এবং সাধারন ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য সংগ্রাম করা;
  • প্রতিটি মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং তার নিজের পছন্দ অনুযায়ী নিজস্ব সামাজিক, অরথনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সমর্থন করা;
  • সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা বা জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সারা বিশ্বের সকল নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

সব মিলিয়েই আমরা একটা সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিও একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ রূপান্তরের ভেতরে আমরা আমাদের পররাষ্ট্র নীতিকে আরও কার্যকর করে এগিয়ে নিতে হবে এবং এটা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। আগামীর বাংলাদেশ সম্ভাবনার পথে যেভাবে এগিয়ে চলেছে তার ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে আমরা সেই প্রত্যাশাই করি।