১৯৭১ সনে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পরিবর্তন ও উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমান আকৃতি এবং অবস্থা নিয়েছে যা সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচন জন্য কর্মসংস্থান এর ক্ষেত্রে গুরুত্ব ভূমিকা পালন করছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য দেশের দরিদ্র বেকার ও অদক্ষ শ্রম শক্তি জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি মাধ্যমে দারিদ্র্য উপশম হয় করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

পেশাগতভাবে, নাগরিক শ্রমশক্তির ৭০ শতাংশ, যা বর্তমানে অনুমান করা হয় ৫৬ মিলিয়ন, প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে কৃষি কাজে জড়িত। মাত্র ১৫ শতাংশ বিভিন্ন শিল্প ক্ষেত্রে নিযুক্ত এর বেশিরভাগ পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নিয়োজিত রয়েছে।

এর সাথে মিলিত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে অসম বন্টন এবং জমির ভারি খণ্ডন সমস্যা। দারিদ্র্য বিমোচনে এবং শিক্ষাগত ও সামাজিক চেতনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও জোরালো ব্যাবস্হা গ্রহণ করলে এর উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রের পর্যাপ্ত পরিচালনার অভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মাথাপিছু দৈনিক খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতা ৪৩২ গ্রাম নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৪৫% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

একবিংশ শতাব্দীর দিকে পদক্ষেপ নেওয়ার সাথে সাথে এর লক্ষ্য ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর করা এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর সকল প্রয়াসের কেন্দ্রবিন্দু হল দারিদ্র্য বিমোচন, পল্লী উন্নয়ন, সকল জাতীয় কর্মকাণ্ডে নারীদের জড়িত করা এবং একটি দ্রুত চলমান প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বিশ্বব্যাপী সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হতে একটি সুশিক্ষিত সুস্থ জাতি গঠন করা।

শ্রম অধিদপ্তর

বাংলাদেশের শ্রম অধিদপ্তর স্থাপিত হয়েছিল বৃটিশ-ভারত বিধির মাধ্যমে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি গোটা ভারতবর্ষের অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ দেখবাল করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তৎকালীন সময় শ্রম অধিদপ্তর বলা হতো ভারতীয় অভিবাসী শ্রম দপ্তর। তৎকালীন সময় শ্রম শক্তি আদিবাসী সেগমেন্ট ক্রমশ বিস্তার লাভ করে সেই সাথে ব্রিটিশ শাসকদের ভারতবর্ষের অভিবাসীয় শ্রমিক কল্যাণ অধিদপ্তর তাদের সীমিত সুযোগ দিয়ে থাকতো এবং একইভাবে সব শ্রমিকের কল্যাণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

১৯৩১ সালে ভারতীয় অভিবাসী শ্রম দপ্তর জেনারেল ভারতীয় অভিবাসী শ্রম দপ্তরকে, শ্রম দপ্তরে রূপান্তরিত করেছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব ছিল সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। প্রাথমিকভাবে দপ্তর প্রধানের নাম দেয়া হয়েছিল শ্রম কমিশনার। কিন্তু ১৯৫৮ সালে সরকারী আদেশের মাধ্যমে মেমো নং- ২৩০/এস-১১১/১এ-৮(২)/৬৯ তারিখের ০৫/০৩/৭০ এর নাম পরিবর্তন করে শ্রম পরিচালক করা হয়। শ্রম পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠর শুরু থেকেই কার্যকরী শ্রমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক যৌথ দরকষাকষি, মধ্যস্থতা এবং শিল্প ক্ষেত্রে শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিতে দ্রুত ও কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) পদে নিয়োজিত আছেন আবদুল লতিফ খান এনডিসি। মোঃ গিয়াস উদ্দীন, মোঃ বেল্লাল হোসেন শেখ ও আবু আশরীফ মাহমুদ পরিচালক পদে নিয়োজিত আছেন এছাড়া মেডিকেল পরিচালক পদে রয়েছেন ডাঃ আলপনা সরকার।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬

শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরীর হার নির্ধারণ, মজুরী পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্যে ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও চাকুরীর অবস্থা ও পরিবেশ এবং শিক্ষাধীনতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে সকল আইনের সংশোধন ও সংহতকরণকল্পে প্রণীত আইন ২০০৬ সালে করা হয় যা পরবর্তীতে ২০১৮ সনে কিছুটা সংশোধন করা হয়।

যেহেতু শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরীর হার নির্ধারণ, মজুরী পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও চাকুরীর অবস্থা ও পরিবেশ এবং শিক্ষাধীনতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে সকল আইনের সংশোধন ও সংহতকরণকল্পে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রপ্তানি

বাংলাদেশে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের বিভিন্ন খাতের মধ্যে অন্যতম প্রধান খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি৷ আমাদের দেশের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখনো জনশক্তি রপ্তানির প্রধান উদ্দেশ্যে৷ বিগত বছরগুলিতে এই শ্রমশক্তি রপ্তানি অনেকাংশে বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আয় কমছে৷

শ্রমশক্তি রপ্তানি খাতে আয় কমার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, জনশক্তি আমাদনীকারক দেশগুলো আমাদের শ্রমিকদের শ্রম অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুরি না দেয়া, এছাড়া দক্ষ শ্রমিকের অভাবও একটি অন্যতম প্রধান কারণ৷

জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানির প্রচলিত বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে৷ তাই প্রয়োজন নতুন বাজার৷ তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেছেন, ‘পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে৷’

বাংলাদেশের শ্রমশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৫ লাখ ৫৬ হাজার বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি বহিঃবিশ্বে রপ্তানি হয়েছে, যা বিগত বছরগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ৷ বর্তমানে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ওমানে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি করছে৷ বিগত বছরগুলিতে সৌদি আরবে সর্বাদিক জনশক্তি রপ্তানি করা হতো কিন্তু বর্তমানে সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে পুরুষ শ্রমিক নেয়া বন্ধ রেখেছে৷

জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘‘সৌদি আরব, দুবাই এবং কাতারে পুরুষ জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ আছে৷ লিবিয়া এবং ইরাকে পাঠানো যাচ্ছে না সেখানকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে৷ আর সিঙ্গাপুরে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও আইএস সন্দেহে সেখানে কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক আটক হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি খারাপের দিকে৷ মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীায় হলেও তারা এখন শ্রমিক নিচ্ছে না৷ অন্যদিকে কোরিয়া তাদের নির্মাণ খাতে বিপূল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার কথা বললেও তা এখনো শুরু হয়নি৷’’

তিনি আরো জানান, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এখন বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা যাচ্ছেন৷ কিন্তু সেখান থেকেও হয়রানি, স্বল্প মজুরি দেয়াসহ নানা অভিযোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে৷’’